Howrah Zilla School Alumni Association

বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বর - তৃতীয় কিস্তি - Howrah Zilla School Alumni Association

বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বর - তৃতীয় কিস্তি

পাড়াতুতো বিশ্বকাপ

23 June, 2018 Total Views: 1188
Howrah Zilla School Alumni Association: Blog

আজ এই ধারাবাহিক এর তৃতীয় কিস্তি।

এই ধারাবাহিকের উদ্দেশ্য আর কিছুই না, শুধু এটুকুই যে পুরোনো শৈশব আর কৈশোরের যে বিস্তীর্ণ মাঠে অগুনতি সুখস্মৃতি আমরা সবাই পেছনে ফেলে এসেছি, যার মধ্যে আছে আমাদের স্কুল, আমাদের ফুটবল, আরও কিছু অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা রাংতায় মোড়া মুহূর্ত, সেগুলো একবার ঝালিয়ে নেওয়া।

আজ তৃতীয় এই কিস্তির লেখার জন্য ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে অনমিত্র রায়কে।

পাড়াতুতো বিশ্বকাপ

=============

বাংলার জেলায় জেলায় হরেক পাড়া। তার মধ্যে বোধ হয় প্রায় সব জেলাতেই একটা করে হালদার পাড়া, মুখার্জি পাড়া, দত্ত পাড়া, বোষ্টম পাড়া থাকেই। এ যেন সেই বীজগণিতে ‘কমন’ নেওয়ার মতো ব্যাপার।

পাড়া (মুখার্জি+দত্ত+হালদার+বোষ্টম)

সেদিন ঘরে বসে কাজ করছি, হঠাৎ কানে এল কাছাকাছি কোথাও থেকে মাইকে জোর ঘোষণা—

‘আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরু হতে চলেছে আমাদের বাসসিক পাওয়ার বল টুন্নামেন্ট। এবারের সিক্স সাইড টুন্নামেন্টের আটটা টিম হল. . . এই বাবলু, নামগুলো বল, আমি ওদিকটা একটু দেখে আসি. . .’

‘আজকের এই সুন্দর রোদ ঝলমলে দিনে, নীল আকাশের তলায় সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে, একটু আগেই হরিদা যেমন বলছিল, আটটা টিম নিয়ে পাওয়ার বল টুন্নামেন্ট . . . খেলতে নামছে, বাজ্জিল, একটু জোরে হাততালি, আজ্জেন্টিনা, জাম্মানি, পত্তুগাল, ফান্স, উরুগুয়ে, এই পঞ্চা, বাকি নাম দুটো তুই বল. . .’

‘বাবলুদা যেমন বলছিল, আজকের এই সিক্স সাইড টুন্নামেন্টের শেষ টিম দুটো হল জাপান, হাততালি হাততালি, খুব জোরে হাততালি হোক, আমাদের এশিয়া থেকে একমাত্র টিম, আর লাস্টে হল গিয়ে ইতালি।’

এবার কানে আসে খুব চেঁচামেচি, হইচই, উত্তেজনা, সঙ্গে হাততালি। আবার ঘোষকের গলা—

‘বলে প্রথম শট মেরে আজকের এই বিশ্বব্যাপী টুন্নামেন্টের উদবোদন করবেন আমাদের “মিতালী সংঘ” ক্লাবের পেসিডেন্ট লাল্টুদা। বলতে বলতেই এসে গেছেন লাল্টুদা। তাঁকে মালা পরিয়ে সম্মর্ধনা জানাল টুকি। এবার লাল্টুদা মাঠের মাঝখানে বসানো বলটাতে পা দিয়ে হালকা টোকা দিলেন। সঙ্গেসঙ্গে সুরু হয়ে গেল এবারের টুন্নামেন্ট। মাঠের চাদ্দিকে দসসোকে দসসোকে ছয়লাপ একেবারে। একটাও ছাদ ফাঁকা নেই, বারান্দাতেও দসসোকের ভিড়। উত্তেজনা চরমে। কী হয় কী হয়! আজকের পথম ম্যাচ আজ্জেন্টিনা ভাসসেস উরুগুয়ে। দুটো টিমই মাঠে চলে এসেছে। আজ্জেন্টিনার মেসি খোকন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে খুব লাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নিজেকে চাঙ্গা করে নিতে চাইছে। ওদিকে উরুগুয়ের ভোম্বল, বিল্টুরাও চুপচাপ বসে নেই। কথা বলতে বলতে খেলা শুরু হয়ে গেল। খোকন কাটাচ্ছে, থুড়ি খোকন নয়, মেসি। কিন্তু মাঠে বোধ হয় কোনো ইটের টুকরো পড়ে ছিল, দেখতে পায়নি,পা-টা সামান্য হড়কাল, সামলে নিয়েছে, দুরন্ত গতিতে এগোচ্ছে, কী হবে বলা যাচ্ছে না, সামনে শুধুই উরুগুয়ের গোলকিপার বিশু, গোল হওয়া উচিত, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেসি খোকন গোলের বাইরে শট মারল। গোটা মাঠ জুড়ে হতাশা। এবার এগোচ্ছে উরুগুয়ের ফরোয়ার্ড মনা, দেখা যাক কী হয় . . .’

আমার কাজ ততক্ষণে থেমে গেছে। আমিও এই ‘পাড়াতুতো বিশ্বকাপ’-এ মজে গেছি। ভাবলাম, একবার দেখে এলে হয় ব্যাপারখানা। তাড়াতাড়ি চান-টান সেরে খেয়েদেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে বিকেলের দিকে না হয় যাওয়া যাবে। ফাইনালটাই দেখব’খন। যদি ফাইনালে ‘বাজ্জিল’ আর ‘আজ্জেন্টিনা’ ওঠে তবে জমে যাবে। অবশ্য লেখার কাজটা তো ফেলে রাখার উপায় নেই। আমারই ছোটোবেলার স্কুলের ওয়েবসাইটে দেওয়ার জন্য চেয়েছে। ভালোই হল একদিকে। এই বিশ্বকাপের গরম হাওয়ায় ‘পাড়াতুতো বিশ্বকাপ’ বেশ খাপ খেয়ে যাবে।

খেয়েদেয়ে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতেই কানে এল, ‘এবারের পাওয়ার বল টুন্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ একটু পরেই শুরু হতে চলেছে। বাজ্জিল বনাম আজ্জেন্টিনা। উত্তেজনার পারদ বেড়েই চলেছে। তার মধ্যে বাজ্জিলের নেইমার বাবুন দু-মিনিটের জন্য একবার বাড়ি গেছে. . .’

চুঁ-ই-ই-ই-ই, চ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যাঁ, চিঁ-ই-ই-ই. . .

‘মাইকের দায়িত্বে আছ ন্যাপা, তুমি যেখানেই থাকো, এক্ষুনি একবার ফিপা-র (ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল পাড়া অ্যাসোসিয়েশন) অফিসে যোগাযোগ করো। মাইকে কিছু গোলমাল দেখা দিয়েছে।’

এর মধ্যে বাবুন, বাজ্জিলের নেইমার, মাঠে ফিরে এসেছে। খেলাও চালু হয়ে গেছে পুরোদমে।

‘বাজ্জিলের ব্যাক তপা, বল বাড়িয়ে দিয়েছে সন্তুর দিকে, সন্তুর সামনে আজ্জেন্টিনার শিবু, সন্তু শিবুকে ট্যাকেল করে এগোচ্ছে, এই কে আছিস, একটু চা-ফা দে না ভাই, গলা যে শুকিয়ে গেল, সন্তু এমন তিরবেগে কোনোদিকে না তাকিয়ে ছুটছে, মনে হয় না আজ কেউ ওকে আটকাতে পারবে, যা ভাবা গেছিল, ঠিক তাই, সামনে শুধু আজ্জেন্টিনার গোলকিপার ছোটন, ছোটনকে একটা হালকা চুক্কি দিল সন্তু, আর তারপরেই গো-ও-ও-ল! ফলাফল বাজ্জিল ১, আজ্জেন্টিনা ০।

গোল দিয়ে যেমন বাজ্জিল আরও চেগে উটেচে, তেমনই আজ্জেন্টিনাও কিন্তু গোল শোধ করার জন্য মরিয়া।

রেফারি বুবানদা বাঁশি বাজাল। হাফটাইম। দু-পক্ষের খেলোয়াড়রাই জল-টল খাচ্ছে, মুখেচোখে জল দিচ্ছে, তাদের জন্য আগে থেকেই ‘জলি’ আইসকিমওলা হরেনদাকে বুক করা ছিল, হরেনদাও গাড়ি নিয়ে হাজির।

হাফটাইম শেষ। আবার খেলা সুরু হল। এবার পথম থেকেই আজ্জেন্টিনাকে দেখে মনে হচ্ছে, খুব শিগগিরি তারা কিছু একটা ঘটাতে চলেছে।

বলতে বলতে আজ্জেন্টিনার মেসি খোকনের পায়ে বল, হয়তো মেসি খোকনের শটেই আজ্জেন্টিনা স্কোর সমান করতে চলেছে, কিন্তু না, সে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে টুক করে বল বাড়িয়ে দিল রমেনের দিকে আর রমেনের গোলার মতো শটে বল জালে, গো-ও-ও-ল!’

এদিকে মাঠে আলো কমতে কমতে এখন আর ভালো দেখা যাচ্চে না। তাই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ম্যাচ ড্র ঘোষণা করেন।

অমনি চারদিকে শুরু হয়ে যায় ফিসফাস। এ আবার হয় নাকি? এরকম গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচ ড্র হতে পারে নাকি? এরপর তো এক্সট্রা টাইম, টাইব্রেকার, সাডেন ডেথ. . .

কিন্তু না. . . পেসিডেন্ট লাল্টুদাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি মাইক হাতে নিলেন, ‘অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য ঘটনা! ফিপা-র ইতিহাসে এই প্রথম ফাইনাল ম্যাচ ড্র হল! কোনো উপায় যে নেই, মাঠে ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা নেই. . .’